করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য অনেক জায়গাতেই বলা হচ্ছে - হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা লিকুইড হ্যান্ডওয়াশ না থাকলে সাধারণ সাবান দিয়ে ২০ সেকেন্ড হাত ধুয়ে নিলেও করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ সম্ভব এবং এটাই করোনা প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এই লেখায়, আমরা সে কথাটির পেছনের কারণগুলো লিখছি।
শুধু পানি দিয়ে হাত ধুলে কেন করোনা ভাইরাস হাতের সাথেই লেগে থাকে?
করোনা ভাইরাস জড় পদার্থের মতই যেকোনো জায়গায় নিশ্চল হয়ে পড়ে থাকে, এমনকি আমাদের হাতেও। পানি দিয়ে হাত ধোয়ার সময়, হাতে অবস্থানকারী করোনা ভাইরাস সেই পানির সাথে ধুয়ে চলে যায় না
সাবান কিভাবে করোনা ভাইরাসকে ধ্বংস করে?
আমরা যদি করোনা ভাইরাসের বাহ্যিক গঠনের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাবো এর চারপাশে প্রোটিন ও চর্বির(Fat) আবরন। করোনা ভাইরাসের উপরের চর্বির আবরনটা এক্ষেত্রে পানিতে ভাসমান তেলের মত আচরন করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ নিচের পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টাকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে৷
পরীক্ষা নং- ১. সাবানের সাহায্যে তেল আর পানিকে মেশানো
তেল আর পানি একসাথে ঝাঁকিয়ে রাখলে, অনেকক্ষণ পর এমন দেখা যাবে
আমরা সবাই জানি, তেল হচ্ছে তরল চর্বি (Fat)। পানি এবং তেল একত্রে মিশিয়ে বা ঝাঁকিয়ে বেশ কিছুক্ষণ পর দেখা যাবে, এরা মিশছে না। পানির উপর তেল ভেসে আছে। তার মানে পানির সাথে তেল (চর্বি) কখনোই মেশে না। এবার এতে কিছু সাবান মেশালে দেখা যাবে, পানি ও তেল একসাথে মিশে যাচ্ছে। এর কারণ খুঁজতে চলো অণু -পরমাণুর জগতে চলে যাই।
সাবানের মধ্যকার অণুগুলোতে দুইটি প্রান্ত থাকে৷ অণুর একপ্রান্ত সর্বদা পানির দিকে টান অনুভব করে এবং তেল/চর্বিকে দূরে ঠেলে দিতে চায়, আর অন্যপ্রান্তের অণুগুলো আকর্ষিত হয় তেল বা চর্বির দিকে এবং পানিকে দূরে ঠেলে দিতে চায়। তাই যখনই তেল এবং পানির মিশ্রনে সাবানের অণুগুলোর প্রবেশ ঘটে, তখনই সাবানের অণুর দ্বৈত আকর্ষণ (dual attraction) এর কারণে চর্বির অণুগুলো আলাদা হয় এবং পানিতে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলেই তেল, পানি এবং সাবান মিশে যাবে।[1]
তাহলে এই পরীক্ষা থেকে আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পারলাম, তেল আর পানিকে একসাথে মেশানো সম্ভব না। তবে, এদের মিশ্রণে সাবান যোগ করলে, তেলের অণুগুলো আলাদা হবে এবং এরা মিশে যাবে।
ডান পাশে সাবান অণুগুলো ভাইরাসের তেল/চর্বি অংশকে ঘিরে ফেলেছে। আর বামপাশের ছবিতে দেখা যাচ্ছে সাবান অণুগুলো ভাইরাসের আবরনকে ভেঙ্গে ফেলতে শুরু করেছে
এখন আমরা পুনরায় করোনা ভাইরাসের কাছে ফিরে যাই। করোনা ভাইরাসের বাইরে চারপাশ ঘিরে ছিল তেল/চর্বির আবরন। সাবান দিয়ে হাত ধুলে যেটা হয় - সাবানের অণুর যে অংশ চর্বিকে আকর্ষণ করে এবং পানিকে দূরে ঠেলে দিতে চায়, সেই অংশ শাবলের মত কাজ করে। অর্থাৎ সে ভাইরাসের বাইরের তেল/চর্বির স্তরকে ভেঙ্গে ফেলে কারণ - ভাইরাসের বাইরের আবরন খুব বেশি শক্তিশালী হয় না।[1] এরপর সেই ভাইরাসের অবশিষ্ট অংশগুলো পানির মাধ্যমে ধুয়ে চলে যায়। এভাবেই করোনা ভাইরাস সাবানের সাহায্যে তোমার হাতেই ধ্বংস হয়ে যাবে।[5]
সাবান দিয়ে করোনা ভাইরাস ধ্বংস করতে কেন ২০ সেকেন্ড সময় দরকার?
সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে তোমার হাতের ভাইরাসকে ধ্বংস করতে কিছুটা সময় দরকার। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, অন্তত ২০ সেকেন্ড। এটি বোঝার জন্য আমরা আরও একটি পরীক্ষা করবো। এই পরীক্ষায় আমাদের দরকার হবে - একটি লোশন যেখানে তেল/চর্বি (Fatty Lotion) আছে। আর দরকার হবে - অতি বেগুনী রশ্মি(Ultra Violate Ray)। অতিবেগুনী রশ্মিতে তেল/চর্বিকে চকচকে দেখাবে।[3]
পরীক্ষা নং-২. হাতে তেলের উপস্থিতি দেখা
প্রথমে তোমার হাতে লোশন মাখাও। এবার অতিবেগুনী রশ্মি ব্যবহার করলে হাতে লোশনের উপস্থিতি দেখতে পারবে। ছোট্ট পরীক্ষাটি করে অতিবেগুনী আলোতে আমরা যা দেখতে পেলাম-
১) যদি তুমি পানি দিয়ে সাধারনভাবে হাত ধুয়ে ফেলো, তাহলে লোশনের (এক্ষেত্রে ভাইরাসের তেলের আবরনের) কিছুই হবে না। হাত চকচকে দেখাবে আগের মতই।
২) যদি সাবান দিয়ে ৫ বা ১০ সেকেন্ডের জন্য হাত ধুয়ে ফেলো, তাহলে হাত আগের চেয়ে কম চকচকে দেখাবে। অর্থাৎ হাত থেকে তেল এখনও পুরোপুরি সরে যায়নি। তবে হাতে তখনো ভাইরাস থেকে যাবে, যা ছড়িয়ে পরতে পারে।
৩) সাবান দিয়ে ২০ সেকেন্ড সময় লাগিয়ে হাত ধোয়ার পর দেখতে পাবে - হাতে কোনো চকচকে অংশ নেই। অর্থাৎ হাত থেকে পুরোপুরিভাবে তেল বা চর্বি সরে গিয়েছে।
তাহলে এই পরীক্ষা করে আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পারি, সাবান দিয়ে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড যাবত হাত ধুয়ে নিলে সেটা ভাইরাসকে পুরোপুরি ধ্বংস করে
কোন ধরনের সাবান ব্যবহার করতে হবে?
অনেকের ধারণা, লিকুইড হ্যান্ডওয়াশ বা বিশেষ ধরনের জীবানু ধ্বংসকারী সাবান(anti bacterial hand soap) ছাড়া অন্য কোন সাবান দিয়ে হাত ধুলে হাত থেকে ভাইরাস ধ্বংস হয় না। এই ধারণা পুরোপুরি ভুল। কেননা, যেকোনো ধরনের সাবান দিয়ে হাত ধুলেই ভাইরাস ধ্বংস হবে। লাইফবয়, ডেটল, তিব্বত, কেয়া, কসকো, লাক্সসহ - যে কোন ধরনের সাবান দিয়ে হাত ধুলেই কাজ হবে।
লাইফবয়ের অফিসিয়াল পেইজ থেকে নেয়া
Food and Drug Administration (FDA) - এ ধরনের বিশেষ জীবাণুনাশক সাবান পরিহার করতে পরামর্শ দিচ্ছে। কেননা, এদের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তাই, যে কোন সাবান দিয়ে মাত্র ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান ব্যবহার করাই যথেষ্ট।
হাত ধোয়ার সাবান ব্যতীত কাপড় কাঁচার সাবান, শ্যাম্পু কিংবা ডিটারজেন্ট কতটুকু কার্যকরী?
শুধুমাত্র হাত ধোয়ার সাবান নয়, বিশেষজ্ঞরা বলছেন কাপড় কাঁচার সাবান, শ্যাম্পু কিংবা ডিটারজেন্ট ভাইরাসকে ধ্বংস করতে অধিক কার্যকরী। সাবান যেভাবে ভাইরাসকে ধ্বংস করে ঠিক সেভাবেই কাপড় কাঁচার সাবান, শ্যাম্পু এবং ডিটারজেন্ট - ভাইরাসকে ধ্বংস করে। তাই, প্রতিদিন সাবান এবং শ্যাম্পু ব্যবহার করে গোসল করা খুবই ভাল অভ্যাস। পাশাপাশি ডিটারজেন্ট দিয়ে কাপড় ধুয়ে ফেললেও ভাইরাস আক্রান্ত হবার কোন ভয় থাকে না।
হ্যান্ড স্যানিটাইজারের প্রয়োজন এবং কার্যকারিতা কতটুকু?
হ্যান্ড স্যানিটাইজারের সুবিধা হল - এটা যে কোন জায়গায় ব্যবহার করা যায়। যেমন - বাসে বা রিক্সায় উঠে তোমার পক্ষে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া সম্ভব না। সেক্ষেত্রে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা দরকার। হ্যান্ড স্যানিটাইজারে থাকা অ্যালকোহল অনেকটা সাবানের মতো কাজ করে থাকে। যেটা ভাইরাসের তেল/চর্বির আবরনটাকে ধ্বংস করে দেয়। এক্ষেত্রে শর্ত হলো, অ্যালকোহলের ঘনত্ব বেশি হতে হবে। Centers for Disease Control and Prevention(CDC) -এর পরামর্শ অনুযায়ী, এমন অ্যালকোহল ব্যবহার করা উচিত, যাদের ঘনত্ব কমপক্ষে ৬০% (যার অর্থ এখানে ৪০% পানি এবং ৬০% অ্যালকোহল রয়েছে) এবং ৬০% ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি কার্যকরী। তবে, সাবানের কোন বিকল্প নাই।[2]
নোংরা-অপরিচ্ছন্ন কিংবা ঘামে ভেজা হাতে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করলে তেমন কোন কাজ হবে না। কিন্তু নতুন বা পুরাতন যেকোনো সাবানই এক্ষেত্রে ভাল কাজ করবে।[3]
হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারে সাবধানতা
হ্যান্ড স্যানিটাইজারে থাকে অ্যালকোহল। তাই এটি একটি দাহ্য পদার্থ। হাতে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারের ক্ষেত্রে এজন্য সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। হাতে হ্যান্ড স্যানিটাইজার মেখে মোটেও রান্নাঘরের চুলার সামনে যাওয়া ঠিক না, কারণ এতে হাতে আগুন ধরার সুযোগ থাকে। তাই হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাবধান থাকা জরুরী।
হ্যান্ড স্যানিটাইজার হাতে লাগানো অবস্থায় আগুনের কাছে গেলে হাতে আগুন ধরতে পারে
২০ সেকেন্ড সময় হিসাব করা
ঘরের বাইরে থেকে এসে অবশ্যই কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড সময় হাত ধুয়ে নিবে
২০ সেকেন্ড যাবত হাত ধোয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ধৈর্যেরও ব্যাপার। তাই তোমাদের জন্য সহজ কিছু উপায় বলে দিচ্ছি। সময়ের হিসাব করতে নিচের বাক্যগুলো পড়তে পারো।
"Happy Birthday To You" ( ৫ বার)
“We will We will rock you” (৫ বার)
"চল চল চল, উর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল" ( ৫ বার)
অথবা হাত ধোয়ার সময় পছন্দের কোনো গান গাইতে পারো ২০ সেকেন্ড ধরে।
তাহলে হয়ে গেলো করোনা ভাইরাস ধ্বংস করার সহজ কিন্তু কার্যকরী সমাধানের বাস্তবায়ন। এই লেখা মূলত পালি থরডারসনের থেকে অনুপ্রাণিত। ইউনিভার্সিটি অফ নিউ সাউথ ওয়েলসের এই প্রফেসর সাবানের গুরুত্বকে খুবই সহজভাবে উপস্থাপন করে টুইট করেন। এরপর উনার লেখা বিশ্বের বিভিন্ন নামকরা জায়গায় ছাপানো হয়। লেখাটি সকল প্রকার অবাণিজ্যিক কাজে এবং সচেতনতা তৈরির কাজে লেখকের নাম উল্লেখ করে ব্যবহার করা যাবে।
রেফারেন্সঃ
[1] How soap absolutely annihilates the coronavirus By Brian Resnick
[2] Show Me the Science – When & How to Use Hand Sanitizer in Community Settings
[3] How soap kills the coronavirus
[4] Why Soap Works by The New York Times
[5] The science of soap – here’s how it kills the coronavirus
সহায়ক লিংকঃ
১। ঘরে বসে যেভাবে অতিবেগুনী রশ্মি(UV Light) বানানো সম্ভব তার লিংক
২। হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে আগুন ধরানোর মজার এক্সপেরিমেন্ট
লিখেছেন-
১। সামিউল ইসলাম (৩য় বর্ষ, ইলেকট্রিকাল এন্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং, রুয়েট)
ইমেইলঃ samiulislamsamin2016@gmail.com
২। আহমদ মুসা (২য় বর্ষ, ইলেকট্রিকাল এন্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং, রুয়েট)
ইমেইলঃ ahmadmusa0000@gmail.com
Comments
Post a Comment