আগস্ট ১২,২০১৮...
মানবসভ্যতার বিজয়মুকুটে নতুন পালক যুক্ত হলো- প্রথমবারের মত কোন নক্ষত্রের একদম কাছাকাছি পৌঁছাবে মানবসৃষ্ট কোন যন্ত্র, পার্কার সোলার প্রোব! নাসার ১৫০ কোটি ডলারের মিশন ‘টাচ দ্য সান’।
ইতিহাসে এই প্রথম জীবন্ত কোন মানুষের নামে মহাকাশ অভিযানের নামকরণ করা হয়...
ইউজিন পার্কার, একজন জ্যোতির্পদার্থবিদ , যিনি সূর্যের করোনার বিভিন্ন ঘটনার ব্যাখা দেবার জন্য ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন! ১৯৫৮ সালে তিনিই প্রথম সৌর ঝড়(solar wind) সম্পর্কে বিশ্বকে জানান।
পার্কার সোলার প্রোবকে নিয়ে পৃথিবীর মানুষের জল্পনা কল্পনার অন্ত নেই! অনেক গবেষনা আর চেষ্টার ফসল এই মিশনটিকে নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন , সূর্যের এতো কাছাকাছি টিকে থাকা যাবে কিভাবে! তাছাড়া অনেকের মনে নাসার এরকম ব্যায়বহুল মিশন নিয়ে একটা ভালো প্রশ্ন উদয় হয় , এতো টাকা খরচ করে আমাদের পৃথিবীর কি উপকারে আসবে সংশ্লিষ্ট মিশনটি!
চলুন, এই পার্কার সোলার প্রোবকে জেনে নেয়ার মাধ্যমে জেনে নেই কতটা বুদ্ধিদীপ্ত উপায়ে তৈরী করা হতে পারে নক্ষত্রের কাছাকাছি যাওয়া কোন স্পেসক্রাফট!
জেনে নেই এতে আমাদের লাভই বা কি হবে!
পার্কার সোলার প্রোব কিঃ
প্রোব হলো এক বিশেষ ধরনের স্পেসক্রাফট যেটি মূলত সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহের চারিদিকে ভ্রমন করে বা গ্রহের পৃষ্ঠে চারন করার মাধ্যমে ওইসব গ্রহ সম্পর্কে গবেষনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছবি পাঠায়,তথ্য পাঠায়...এছাড়াও মহাবিশ্বের অন্যান্য ঘটনা বা ফ্যাক্ট সম্পর্কে গবেষনার জন্যও প্রোব পাঠানো হয়ে থাকে।
পার্কার সোলার প্রোব প্রধানত এমন একটি প্রোব যা এই প্রথম কোন নক্ষত্রের কাছাকাছি ভ্রমনের মাধ্যমে সেটি থেকে আমাদের তথ্য ও ছবি পাঠাবে...এটি আকারে ছোটখাটো একটি প্রাইভেট কারের সমান।
সূর্য থেকে প্রায় ৩৮ লক্ষ ৩০ হাজার মাইল ওপরে থাকবে প্রোবটি।
এর উৎক্ষেপণ:
Cape Canaveral Air Force Station এর Space Launch Complex-37 থেকে 3.35 a.m এ এটি উৎক্ষেপণ করা হয়...
এটি কে মহাকাশে নিয়ে যায় Delta IV Heavy নামের একটি শক্তিশালী রকেট, SpaceX এর Falcon Heavy এর আগে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী উৎক্ষেপক রকেট হিসেবে গণ্য হতো..
এর গতিবেগ :
পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে... আমরা জানি বৃত্তাকার পথে ঘূর্ণায়মান কোন বস্তুর , তার বৃত্তাকার পথের স্পর্শক বরারর একটি রৈখিক বেগ থাকে...পৃথিবীর জন্য এই বেগ ৬৭০০০ মাইল/ঘণ্টা।
আমরা পৃথিবী থেকে পার্কার সোলার প্রোবকে সৌরজগতের কেন্দ্রে পাঠাতে চাই, কিন্তু পৃথিবীর রৈখিক বেগের জন্য প্রোবটির বেগের একটি উপাংশ থেকে যায় যেটি আমাদের এই কাজটিকে কঠিন করে তুলে...
আর তাই পার্কার সোলার প্রোবকে এমন ভাবে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয় যাতে সেটি পৃথিবীর রৈখিক বেগের জন্য একই দিকে বরাবর তার যে বাড়তি বেগ সেটির বেশিরভাগই শূন্য করে দিতে পারে...এর জন্য আমাদের খরচ করতে হয়েছে অনেক বেশি পরিমানের শক্তি!
পরবর্তীতে প্রোবটি ব্যাবহার করবে শুক্রের কক্ষপথ... ৭ বছর ধরে প্রায় ৭ বার শুক্রকে প্রোবটি প্রদক্ষিণ করবে, যাতে শুক্রের মহাকর্ষ বল প্রোবটির গতিবেগ কমিয়ে দেয় ...যেহেতু পৃথিবীর রৈখিক বেগের দিক আর প্রোবকে শুক্র যেই বলে আকর্ষণ করবে তার দিক পরষ্পর বিপরীত ..
সেহেতু প্রোবটির গতিবেগে থাকা বাকবাকি বেগের উপাংশও কমে যাবে..ফলে এটি সহজেই সূর্যের দিকে ধাবিত হবে...
এক্ষেত্রে বেগ কমে গেলেও এটি সূর্যের যত কাছে যেতে থাকবে , সূর্যের মহাকর্ষ বলের প্রভাবে প্রোবটি অনেক বেশি বেগে সূর্যের দিকে যেতে থাকবে, আর ক্রমান্বয়ে এটির বেগ এতোই বেশি হবে যে এটিকে বলা যাবে মানবসৃষ্ট সবচেয়ে দ্রুতগতির বস্তু!!!
ধারনা করা হচ্ছে এর গতিবেগ হবে ৪৩০,০০০ মাইল/ঘন্টা।
এর কাজঃ
সূর্য আমাদের কাছে একদম ধরা ছোঁয়ার বাইরে ছিলো এতোদিন...দূর থেকে এর অনেক রহস্যময় ঘটনা আমরা দেখে এসেছি এতোদিন ধরে...তার মাঝে একটি হলো সৌরঝড়...
আমরা সবাই জানি সূর্য অনেক উত্তপ্ত, স্বাভাবিকই সূর্যের বাইরের আবরন, অর্থাৎ সূর্যের অ্যাট্মোস্ফিয়ার যাকে বলা হয় সেটিও অনেক উত্তপ্ত... সূর্যের ভেতরের স্তর থেকে বাইরের স্তর তুলনামূলক কম উত্তপ্ত...
কিন্তু বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে লক্ষ করে এসেছিলেন এতোদিন যে সূর্যের অ্যাটমোসফিয়ারের পর এক বিশেষ আবরন আছে, যে টি কিনা উত্তপ্ত গ্যাস,প্লাজমা ও আয়নিত কণার আবরন... সূর্যের অ্যাটমস্ফিয়ারের থেকে অনেক অনেক বেশি উত্তপ্ত! কিন্তু এর পেছনে কি কারণ কাজ করে সেটি এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে ধোঁয়াশা...
করোনাতে থাকা শক্তিশালী ম্যাগনেটিক ফিল্ডের জন্য এই অঞ্চলে বিচিত্র ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়, যেমনঃ করোনার লুপ, করোনার হোল ,সোলার উইন্ড/ সোলার স্ট্রম ইত্যাদি
এই করোনা অঞ্চল থেকে আয়নিতগ্যাস বা প্লাজমা খুব দ্রুত গতিতে বের হয়ে পুরো সৌরজগতে ছড়িয়ে যায়, যাকে আমরা বলি সোলার উইন্ড...এই সোলার উইন্ড আমাদের পৃথিবীর অ্যাট্মস্ফিয়ারে আঘাত হানে প্রায়ই ,যার ফলাফল আমরা দেখতে পারি আমাদের মেরু অঞ্চলের অরোরা হিসেবে ...এর গতি অসম্ভব রকমের দ্রুত, যার কারন এখনও বিতর্কিত...
অর্থাৎ সূর্যের করোনাতে হতে থাকা বিভিন্ন ঘটনা আমরা দূর থেকে এতোদিন পর্যবেক্ষণ করে যথেষ্ট পরিষ্কার ধারনা পাইনি, করোনাতে ঘটতে থাকা এসব প্রাকৃতিক ঘটনার প্রকৃতি, কারন ইত্যাদি বিশ্লেষন করে স্পষ্ট ধারনা পেতে আমাদের সাহায্য করবে এই সোলার প্রোবটি!
কার্যপ্রণালী ও তাপসহনশীলতাঃ
এটি সূর্যের খুব কাছাকাছি থেকে সূর্যের করোনা থেকে আসা রেডিয়েশন, আয়ন ইত্যাদি থেকে বিভিন্ন সেন্সরের মাধ্যম্যে ইনফরমেশন( তাপমাত্রা, গতি , শক্তি,ঘনত্ব ইত্যাদি) সংগ্রহ করবে, রেডিয়েশন এর ম্যাপিং করবে এবং সূর্যের বিভিন্ন ঘটনার ছবি তৈরী করে আমাদের পাঠাবে...ম্যাগনেটিক ফিল্ড সেন্সর, প্লাজমা ভোল্টেজ মাপবার ডিভাইস ইত্যাদি থাকছে এই প্রোবে...
পার্কার সোলার প্রব সূর্যের দিকে সরাসরি কোন ইমেজার(ছবি তোলার ডিভাইস) ব্যাবহার করবে না, তাপমাত্রা থেকে রক্ষা পাবার জন্য...
সোলার উইন্ড আর করোনার বিভিন্ন ইমেজ তৈরীর জন্য প্রোবে রয়েছে WSPR নামের একটি সম্মিলিত ডিভাইস...করোনা থেকে আসা উইন্ড বা রেডিয়েশন যখন স্পেসক্রাফটটিকে অতিক্রম করবে প্রধানত তখন এই ডিভাইস এদের ইমেজ তৈরীতে মাঠে নামবে।
এসব ডিভাইস স্পেসক্রাফটটির মূল অংশ, আর এদেরকে সূর্যের করোনার প্রচন্ড তাপমাত্রা থেকে বাঁচানোর জন্য প্রোবের সামনে, অর্থাৎ সূর্যের মুখোমুখি দিকে রয়েছে হিট প্রটেকটর শিল্ড!
সাদা রঙ এর এই শিল্ডের মূল কাজ হলো তাপশক্তির প্রতিফলন ঘটিয়ে প্রোবের মূল অংশকে ঠান্ডা রাখা
শিল্ডটি মূলত তৈরী কার্বন-কার্বন কম্পোজিট ( Reinforced কার্বন ফাইবার ) দিয়ে..এটি মূলত অতিউচ্চতাপসহনশীল এবং তাপ প্রসারন সহগ খুবই কম...
শিল্ডের ভেতরে রয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ ইঞ্চির কার্বন কম্পোজিট ফোম, যেটি কার্বন দিয়ে তৈরী আরেক বিশেষ গঠন, এর ভেতরে ৯৭% বাতাস রয়েছে...ফলে অনেক হালকা কিন্তু শক্তিশালী একটি গঠন পাওয়া যায়...এটিও খুব ভালো তাপ প্রতিরোধক বা ইনসুলেটর...এটি তৈরীতে খরচও খুব কম...।ফলে প্রোবের ভেতরের তাপমাত্রা থাকবে মাত্র ৮৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট।
হিট শিল্ডটি ঠিকঠাক পজিশনে আছে কিনা সেটি জানার জন্য এবং পজিশন সঠিক রাখার জন্য প্রোবটিতে রয়েছে সোলার লিম্ব সেন্সর, যেগুলো প্রোবের একদম পেছনে থাকে..
শিল্ডটি ঠিকঠাক পজিশনে অর্থাৎ প্রোবের মূল অংশকে সূর্য থেকে একদম ঢেকে রাখলে এই সেন্সর গুলো ছায়াতে থাকবে, যদি এগুলো আলোর সংস্পর্শে আসে তখন বোঝা যাবে যে প্রোবোটি ঠিক পজিশনে নেই, তখন সে প্রোবের পজিশন ঠিকঠাক করার জন্য মাঠে নামবে...
প্রোবটি প্রচন্ড তাপমাত্রা থেকে মূল অংশকে শিল্ড দিতে পারলেও মূল অংশের ক্রমান্বয়ে গরম হয়ে নষ্ট হবার হাত থেকে বাচানোর জন্য প্রতিনিয়ত প্রোবকে ঠান্ডা করতে হবে...আর এজন্য সেখানে রয়েছে ঠান্ডা পানির প্রবাহ এর মাধ্যমে বস্তুকে ঠান্ডা রাখার সেই অতি সাধারন পদ্ধতিটি...
৬) মিশনটির অবদানঃ
সূর্য থেকে আসা প্রচন্ডগতির সোলার উইন্ড আমাদের পৃথিবীতে যথেষ্ট প্রভাব ফেলে... প্রচন্ড গতির শক্তিশালী এই প্লাজমা প্রবাহ আর রেডিয়েশন আমাদের স্যাটেলাইটগুলো থেকে শুরু করে পৃথিবীতে থাকা পাওয়ার প্ল্যান্ট গুলোও একদম বন্ধ করে দিতে পারে..এছাড়াও আরো অনেক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে...
সূর্যের এসব রহস্যময় ঘটনাগুলো বিশ্লেষন করার মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবনরক্ষাকারী , একমাত্র নক্ষত্রটি আশীর্বাদই শুধু পাবোনা, অভিশাপ থেকেও নিজেদের রক্ষা করার পথ খুঁজে পাবো!
Jannatul Feardous Nishi,
EEE,16
RUET

Comments
Post a Comment