বিখ্যাত নারী জ্যোতির্বিদ জোসেলিন বেল বার্নেলের আটাত্তরতম জন্মবার্ষিকী আজ। কৃতবিদ্য এই জ্যোতির্বিদ পৃথিবীব্যাপী বিখ্যাত পালসার আবিষ্কারের কারণে। তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে তাঁরই লেখা একটি আত্মজীবনীমূলক প্রবন্ধের অনুবাদ করা হয়েছে Astronomy & Science Society of RUET এর পক্ষ থেকে।
পালসার আবিষ্কারের গল্প:
গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের দিকে ফিরে তাকালে দেখতে পাই মেয়েদের পেশাগত জীবন ছিল একটা সীমিত গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ। আমি তখন ছোট। মেয়ে হিসেবে সমাজ আমার কাছে খুব সামান্যই চাইত। বিয়ে করা এবং একজন অর্ধাঙ্গ-অনুগত ঘরবন্দী গৃহিণী হিসেবে জীবন কাটানো। এইসব স্বতঃসিদ্ধের ওপর ভিত্তি করেই মেয়েদের জীবনের নানা দিক নির্ধারিত হয়ে যেত।
আমরা যখন মাধ্যমিক স্কুলে যেতে শুরু করলাম, লক্ষ্য করলাম, ছেলেরা বিজ্ঞান শিখছে, কিন্তু মেয়েদের শেখানো হচ্ছে সূচিশিল্প ও রান্নার কাজ৷ বিজ্ঞানকে আমার খুবই কৌতূহলোদ্দীপক মনে হলো এবং আমি মনে প্রাণে বিজ্ঞান পড়তে চাইলাম। পুরো বিজ্ঞান ক্লাসে আমরা মাত্র তিনজন মেয়ে ছিলাম, বাকি সকলেই ছেলে। সম্ভবত আমরাই আমাদের স্কুলে প্রথমবারের মত মেয়ে শিক্ষার্থী হিসেবে বিজ্ঞান পড়তে শুরু করেছিলাম।
আমাদের প্রথম টার্মে পদার্থবিজ্ঞান ছিল, আমার বিষয়টি খুবই ভালো লেগে যায়। ক্লাসে প্রথম হয়ে যাই। পরের টার্মে রসায়ন একরকম গেলেও জীববিজ্ঞান আমার বড়ই একঘেয়ে লেগেছিল (ফুল আঁকা, গাছের বিভিন্ন অঙ্গের নাম শেখা ইত্যাদি)। কাজেই বলা যায়, পদার্থবিদ্যার প্রতি আমার পক্ষপাতিত্ব সেই ১২ বছর বয়সেই শুরু হয়েছিল!
পরবর্তী বছরগুলোতেও আমি পদার্থবিজ্ঞানে ভালো করতে থাকি। তেরো কি চৌদ্দ বছর বয়সে, আমরা বৃত্তাকার গতি শিখছিলাম। তখনই একদিন লাইব্রেরি থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি বই আমি বাড়িতে নিয়ে আসি। দ্রুতই আমি নক্ষত্র এবং বৃহৎ ছায়াপথ নিয়ে পড়তে শুরু করলাম৷ একেকটি ছায়াপথ কি না একশ মিলিয়ন নক্ষত্রকে নিয়ে ঘুরছে! হঠাৎই আমি আমার পদার্থবিদ্যা ক্লাসের বৃত্তাকার গতির সাথে এই ঘূর্ণনের একটা সাদৃশ্য দেখতে পেলাম। সেই উচ্ছ্বসিত মুহূর্তেই ঠিক করে ফেললাম, বড় হয়ে একজন জ্যোতির্বিদ হব!
কিন্তু মেয়ে হওয়া ছাড়াও আরো একটা সমস্যা তখনো ছিল - আমার ঘুম দরকার! সারা রাত জেগে নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ আমার পক্ষে অসম্ভব… কাজেই আমি জ্যোতির্বিদ হতে পারব না!
১৯৫০ সাল নাগাদ জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি বিশেষ শাখা রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞান যাত্রা শুরু করেছিল। বেতার তরঙ্গদৈর্ঘ্যে সূর্য দৃশ্যমান তরঙ্গের মত আকাশে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না, তাই দিনের আলোতেও দিব্যি রেডিও জ্যোতির্বিদ্যার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। আমি যদি একজন রেডিও জ্যোতির্বিদ হই, তাহলেই জ্যোতির্বিজ্ঞানও করতে পারব, আবার রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতেও পারব!
বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যায় একটা ভালো গ্রেড পাওয়া ছিল প্রথম পদক্ষেপ এবং পরবর্তীতে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞানে গবেষণা করার সু্যোগ পেয়ে যাই৷ ক্যামব্রিজ একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় এবং সেই সময়ে মেয়েদের জন্য সেখানে অতি সামান্যই সুযোগ ছিল।
আমি ঘটনাটায় অভিভূত হয়ে যাই, এবং ধরেই নিই তাঁরা নিশ্চয়ই ভুল করে আমাকে ভর্তি হবার সু্যোগ দিয়েছেন। প্রায়ই ভাবতাম, যেকোনো দিন তাঁরা তাঁদের ভুল বুঝতে পারবেন এবং আমাকে পত্রপাঠ বিদায় দেবেন (আমরা এখন এই অনুভূতিটাকে ইম্পোস্টার সিনড্রোম বলে থাকি)। কাজেই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি সৎভাবে আমার গবেষণাটির পেছনে কঠোর পরিশ্রম করে যাব। তাঁরা যখন আমাকে বের করে দেবেন, আমি যেন নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিতে পারি যে, আমি আমার সর্বোচ্চটুকু দিয়েছিলাম। কাজেই আমার গবেষক জীবনটি ছিল অত্যন্ত পরিশ্রমী।
রেডিও টেলিস্কোপটি বানানোর পেছনে প্রথম দুই বছর ব্যয় করলাম - প্রায় পুরোটাই হাতের কাজ - এবং তারপরে এর প্রথম ব্যবহারকারী হিসেবে আমার গবেষণায় এটি ব্যবহার করতে শুরু করলাম। আমার তখনো কোনো কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ ছিল না ; আমার উপাত্তগুলো প্রতিঘন্টায় ১২০ সেন্টিমিটার লম্বা চার্ট আকারে আসত, দিনে ২৪ ঘন্টায়। আমার ছয় মাসের পর্যবেক্ষণে সবমিলিয়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার লম্বা উপাত্ত চার্ট তৈরি হয়ে গিয়েছিল। পুরোটা হেঁটে দেখতে গেলে ৬,৫০০ টি পদক্ষেপের প্রয়োজন হত!
উপাত্তগুলো বেশ কার্যকরী ছিল, আমি নানারকম গবেষণায় মন দিতে পারছিলাম। কিন্তু গোল বাঁধল একটা উপাত্তে। টেলিস্কোপ থেকে এমন একটি সিগনাল আমি আলাদা করতে পারলাম, যার ব্যাখ্যা আমার কাছে ছিল না। ছোট্ট একটি সিগনাল, আমার চার্ট পেপারের প্রতি পাঁচশ মিটারে মাত্র অর্ধেক সেন্টিমিটার জায়গা নিয়ে থাকে। আমি খুব হন্যে হয়ে এই সিগনালটি খুঁজতে শুরু করলাম, এটা হঠাৎ করেই গায়েব হয়ে যায় কোথায়! একমাস পর যখন এটিকে আবার খুঁজে পেলাম, খেয়াল করলাম প্রতি ১.৩ সেকেন্ড পরপর এটির একটা স্পন্দন পাওয়া যায়।
এর আগে এমন কোনো কিছুর অস্তিত্ব কেউ পায়নি এবং আমাদের নিশ্চিত হতে হবে যে এটি আসলেই মহাকাশ থেকে আসা একটা বেতার নির্গমনের চিন্হ!
বিরসমুখে আমি সেই সন্ধ্যায় ঘরে ফিরলাম। এই ক্যামব্রিজে নতুন পদ্ধতির ব্যবহার ঘটিয়ে আমি একটা পিএইচডি পাওয়ার চেষ্টা করছি, আর কিছু বেঁটে খাটো সবুজ এলিয়েনদের যোগাযোগের জন্য আমার ফ্রিকোয়েন্সিটাই কি না বেছে নিতে হলো!
মজার ব্যাপার হলো, এরপর আমি দ্বিতীয় আরেকটা সিগনাল (১.২৫ সেকেন্ড স্পন্দনবিশিষ্ট) খুঁজে পেলাম, আকাশের অন্য এক প্রান্ত থেকে। এরপর তৃতীয়টা, চতুর্থটা; প্রত্যেকেই স্থিরভাবে নিজ নিজ স্পন্দন নিয়ে সিগনাল পাঠাচ্ছে।
এভাবেই আমি একটা নতুন ধরণের তারা আবিষ্কার করে ফেললাম, এখন যাদের ডাকা হয় 'পালসার' বলে। পালসারগুলো একেকটা লাইটহাউজের মত, সারা আকাশ জুড়ে নির্দিষ্ট সময় পর পর রেডিও তরঙ্গের একটা দীপ্তি দিয়ে যায় - আর প্রতিবার পৃথিবীর ওপর দিয়ে এটি যাবার সময় আমরা সেই দীপ্তিটি দেখতে পাই৷ বর্তমানে কয়েকশো পালসারের খোঁজ আমরা পেয়েছি এবং শত শত জ্যোতির্বিদ এটি নিয়ে কাজ করেন।
মূল লেখা: জোসেলিন বেল বার্নেল
অনুবাদ: রুকাইয়া বিনতে রশীদ

Comments
Post a Comment