Skip to main content

ভেরা রুবিন : ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব প্রমাণকারী প্রথম ব্যক্তিত্ব

 


বেশ কিছু যুগ আগের কথা। একটা ছোট্ট মেয়ে জানালা দিয়ে অপলক দৃষ্টিতে নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে থাকত। তার অনেক বছর পরে, নিজের শৈশব নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, "ঘুমানোর চেয়ে রাত জেগে নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে থাকতেই আমার বেশি ভালো লাগত।" এই ছোট্ট মেয়েটি বড় হয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানকে বেছে নেয় এবং তাঁর পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা থেকে উঠে আসে কৃষ্ণবস্তুর ধারণা। সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানমহল নতুনভাবে ভাবতে শুরু করে।  বলছি কৃষ্ণবস্তুর আবিষ্কারক, বরেণ্য নারী জ্যোতির্বিদ ভেরা রুবিনের কথা। আমেরিকান এই জ্যোতির্বিদ ১৯২৩ সালের ২৩শে জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। ভেরা রুবিনের আটানব্বইতম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নিয়ে Astronomy and Science Society of RUET এর আজকের আয়োজন।
নারীরাই ছিলেন ভেরা রুবিনের মূল অনুপ্রেরণা
১৯৪৫ সালে ভেরা রুবিন যখন কলেজে যেতে শুরু করলেন, তখনও মেয়েদের বিজ্ঞান পড়তে নিরুৎসাহিত করা হত। যদিও কিছু অপ্রতিরোধ্য নারীরা তখনও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে বিজ্ঞানে অবদান রাখা শুরু করেছেন, তারপরও সেই বিষয়গুলো খুবই হালকা দৃষ্টিতে দেখা হত। যথাযোগ্য মর্যাদা কখনোই দেয়া হত না। তাঁদেরই একজন ছিলেন মারিয়া মিশেল। উনিশ শতকের এই নারী জ্যোতির্বিদ উল্কা আবিষ্কারের কারণে বিখ্যাত ছিলেন এবং ভেসার কলেজে তিনিই প্রথম নারী প্রফেসর হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। ভেরা রুবিন মারিয়ার ব্যাপারে জানতেন এবং তাঁর কারণেই ভেসার কলেজকে পড়াশোনার জন্য বেছে নিয়েছিলেন। তিনি জানান, "আমি জানতাম এমন একটি স্কুল আছে যেখানে মেয়েরা জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়তে পারে। তাই আমার কখনো মনেই হয়নি যে আমি জ্যোতির্বিদ হতে পারব না।"
আত্মবিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও, সারাজীবনই তাঁকে নারীবৈষম্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়েছে। তাঁর স্কুল শিক্ষক তাঁকে বলেছিলেন, তুমি যতদিন বিজ্ঞান থেকে দূরে থাকবে ততদিন ভালো থাকবে। জীবনের অনেক সময়ই তাঁকে পুরুষ পরিবেষ্টিত জায়গায় কাজ করতে হয়েছে এবং নানা ভাবে এঁরা তাঁকে হেনস্তা করতে চেষ্টা করেছেন। 
টেলিস্কোপ ব্যবহারের অনুমতিপ্রাপ্ত প্রথম নারী-ব্যক্তিত্ব
রুবিনের সময়কালে, পালোমার অবজারভেটরি ছিল জ্যোতিবৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য অসাধারণ এক সুযোগ। কোয়াসার শিফট থেকে শুরু করে সুপারনোভা বিস্ফোরণ সবই আবিষ্কৃত হয়েছিল পালোমার অবজারভেটরির টেলিস্কোপ ব্যবহার করে। এত অগ্রসর একটি অবজারভেটরি হলেও নারীদের বেলায় এর নিয়মকানুন পুরোপুরি পশ্চাৎপদ। পালোমার অবজারভেটরির কোনো যন্ত্রপাতি ব্যবহার নারীদের জন্য পুরোপুরি নিষিদ্ধ।
তবে ভেরা রুবিনের খ্যাতি প্রথমবারের মত মেয়েদের পালোমারের যন্ত্রপাতি ছুঁয়ে দেখার অনুমতি দিল। ১৯৬৩ সালে পুরোপুরি নারী-বিরুদ্ধ পরিবেশে তিনি পালোমার অবজারভেটরির টেলিস্কোপে কাজ করতে শুরু করেন। 
সাড়া জাগানো বৈজ্ঞানিক অবদান
পালোমার অবজারভেটরি এবং আরো বিভিন্ন জায়গা থেকে পর্যবেক্ষণের পর, ছায়াপথের ঘূর্ণন বিষয়ে তিনি বিশেষজ্ঞ হতে শুরু করেন। তবে তাঁর সবচেয়ে সাড়া জাগানো আবিষ্কারটি সামনে আসতে আরো এক দশক সময় লাগে। ১৯৭০ সালে তিনি একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করেন। অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথের ঘূর্ণন মোটেই আশানুরূপ নয়, টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণে অন্তত তাই পাওয়া যায়। এরপর টানা দুই বছর প্রায় দুই শতাধিক পর্যবেক্ষণ ও হিসাবনিকাশের পর তিনি বুঝতে পারেন, তিনি আসলে কৃষ্ণবস্তুর(dark matter) সাক্ষাৎ প্রমাণের দিকে তাকিয়ে আছেন।
১৯৩০ এর দশক থেকেই কৃষ্ণবস্তুর ধারণা প্রচলিত থাকলেও এটি প্রমাণ করতে পারেননি কেউই। রুবিন বুঝতে পারেন,ছবিগুলো থেকে তিনি এমনকিছু জিনিসের অস্তিত্ব টের পাচ্ছেন যেগুলো আসলে সরাসরি দেখা যায় না, শক্তি বা বস্তুও বিকিরণ করে না, এ এক আজব বস্তু৷ যেসব ছায়াপথ রুবিন পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, মহাকর্ষ সূত্র অনুসারে সেগুলোর কেন্দ্রের গতিবেগ বাইরের অংশের চেয়ে বেশি হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু দেখা গেল বাইরের এবং ভেতরের সমস্ত নক্ষত্রই একই গতিবেগে ঘোরে, অর্থাৎ নিশ্চয়ই কিছু বস্তুর উপস্থিতি আছে আশেপাশে, যার কারণে এইসব নক্ষত্রের গতির ওপর প্রভাব পড়ে।
আজ আমরা জানি, মহাবিশ্বের ২৩ শতাংশ জুড়ে আছে কৃষ্ণবস্তু বা ডার্ক ম্যাটার, ৭৩ শতাংশ ডার্ক এনার্জি। এই ধারণাটি পুরো পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের মূল ভিত্তিগুলোকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। আজও বিজ্ঞানীরা ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির গূঢ় তত্ত্ব জানতে নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করে চলেছেন।
রুবিন কখনো নোবেল পুরস্কার পাননি
পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের দুনিয়ায় ভেরা রুবিন একজন বিখ্যাত এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তবে তিনি কখনো বিজ্ঞানের সবচেয়ে মর্যাদাময় পুরস্কারটি পাননি। এমিলি লেভাস্ক নামের একজন জ্যোতির্বিদ দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছিলেন, "বিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলোকে স্বীকৃতি দেয়ার লক্ষ্যে নোবেল পুরস্কার চালু হয়েছিল, যদি ডার্ক ম্যাটার এই কাতারে না পরে, তবে আমার জানা নেই কী এই পুরস্কারের আওতাভুক্ত।" ২০১৬ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞান জগতের এই মহা নক্ষত্রের পতন হয়। তাঁর নামটি নানাভাবে স্মরণ করা হলেও, নোবেল প্রাইজ না পাওয়া আরো মহান কিছু ব্যক্তিত্বের সাথে উচ্চারিত হয়। নোবেল বঞ্চিত রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন বা এস্থার ল্যাডারবার্গ, এইসব মহিয়সী নারীদের গল্প আমরা আরেকদিন শুনব। 
ভেরা রুবিন হয়তো নোবেল পুরষ্কার পাননি, তবে যুগ যুগ ধরে আগামী প্রজন্মের কাছে তিনি অনুকরণীয় হয়ে বেঁচে থাকবেন। কার্নেগি ইন্সটিটিউটে তাঁর নামে একটি পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ ফান্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি চালু করেছে 'ভেরা রুবিন আর্লি ক্যারিয়ার প্রাইজ'। মঙ্গলের একটি শৈলশিরা এবং একটি গ্রহাণুর নামও তাঁর স্মরণে নামকরণ করা হয়েছে। ২০১৯ সালের ২০ ডিসেম্বর, 'লার্জ সিনোপটিক সার্ভে টেলিস্কোপ'(LSST) এর নাম বদলে রাখা হয় 'ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরি'।
ভেরা রুবিন বেঁচে থাকবেন শত বিজ্ঞান অনুরাগীর প্রাণে, হাজার হাজার বছর।
(স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন অবলম্বনে পুনর্লিখিত)

Comments

Popular posts from this blog

হিউ নরম্যান রস: কৌতূহলী অনুসন্ধানকারী থেকে পুরাতন পৃথিবী সৃষ্টিবাদী গোষ্ঠী "Reason to Believe" এর প্রতিষ্ঠাতা হওয়ার গল্প

  সত্য-মিথ্যা, তর্কে-বিতর্কে সমৃদ্ধ এই বিজ্ঞানের পথচলার সাথে যারা প্রতিনিয়ত সৃষ্টিকর্তা ও তাঁর অসীম মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য উদঘাটনের যোগসূত্র খুঁজে বেড়াচ্ছেন, তাদের মধ্যে কানাডিয়ান অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট হিউ নরম্যান রস অন্যতম। আজ তার ছিয়াত্তরতম জন্মবার্ষিকী।  ১৯৪৫ সালের ২৪ শে জুলাই কানাডার কুইবেক, মন্ট্রিলে জন্মগ্রহণ করেন হিউ রস। জোতির্বিজ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি তিনি একজন খ্রিষ্টান অ্যাপোলোজিস্ট এবং পুরাতন পৃথিবী সৃষ্টিবাদী। তিনিই "𝐑𝐞𝐚𝐬𝐨𝐧 𝐭𝐨 𝐁𝐞𝐥𝐢𝐞𝐯𝐞" (𝐑𝐓𝐁) এর প্রতিষ্ঠাতা। প্রকৃতি ও প্রত্যেকটি সৃষ্টির মধ্যে স্রষ্টার ভূমিকা ব্যখ্যা করে তিনি অনেক বই রচনা করেছেন যা বিপুল সংখ্যক মানুষের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছে। তার প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য বইগুলো হচ্ছে: 𝐓𝐡𝐞 𝐂𝐫𝐞𝐚𝐭𝐨𝐫 𝐚𝐧𝐝 𝐭𝐡𝐞 𝐂𝐨𝐬𝐦𝐨𝐬, 𝐓𝐡𝐞 𝐅𝐢𝐧𝐠𝐞𝐫𝐩𝐫𝐢𝐧𝐭 𝐨𝐟 𝐆𝐨𝐝,𝐖𝐡𝐲 𝐭𝐡𝐞 𝐔𝐧𝐢𝐯𝐞𝐫𝐬𝐞 𝐢𝐬 𝐭𝐡𝐞 𝐰𝐚𝐲 𝐢𝐭 𝐢𝐬,𝐀 𝐌𝐚𝐭𝐭𝐞𝐫 𝐨𝐟 𝐃𝐚𝐲𝐬, 𝐁𝐞𝐲𝐨𝐧𝐝 𝐭𝐡𝐞 𝐂𝐨𝐬𝐦𝐨𝐬 ইত্যাদি।  মানবসভ্যতার প্রারম্ভ থেকেই কৌতূহল খুলে দিয়েছে নতুন নতুন উদ্ভাবনার দ্বার। হিউ রসের ক্...

পার্কার সোলার প্রোব

  আগস্ট ১২,২০১৮... মানবসভ্যতার বিজয়মুকুটে নতুন পালক যুক্ত হলো- প্রথমবারের মত কোন নক্ষত্রের একদম কাছাকাছি পৌঁছাবে মানবসৃষ্ট কোন যন্ত্র, পার্কার সোলার প্রোব! নাসার ১৫০ কোটি ডলারের মিশন ‘টাচ দ্য সান’। ইতিহাসে এই প্রথম জীবন্ত কোন মানুষের নামে মহাকাশ অভিযানের নামকরণ করা হয়... ইউজিন পার্কার, একজন জ্যোতির্পদার্থবিদ , যিনি সূর্যের করোনার বিভিন্ন ঘটনার ব্যাখা দেবার জন্য ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন! ১৯৫৮ সালে তিনিই প্রথম সৌর ঝড়(solar wind) সম্পর্কে বিশ্বকে জানান। পার্কার সোলার প্রোবকে নিয়ে পৃথিবীর মানুষের জল্পনা কল্পনার অন্ত নেই! অনেক গবেষনা আর চেষ্টার ফসল এই মিশনটিকে নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন , সূর্যের এতো কাছাকাছি টিকে থাকা যাবে কিভাবে! তাছাড়া অনেকের মনে নাসার এরকম ব্যায়বহুল মিশন নিয়ে একটা ভালো প্রশ্ন উদয় হয় , এতো টাকা খরচ করে আমাদের পৃথিবীর কি উপকারে আসবে সংশ্লিষ্ট মিশনটি! চলুন, এই পার্কার সোলার প্রোবকে জেনে নেয়ার মাধ্যমে জেনে নেই কতটা বুদ্ধিদীপ্ত উপায়ে তৈরী করা হতে পারে নক্ষত্রের কাছাকাছি যাওয়া কোন স্পেসক্রাফট! জেনে নেই এতে আমাদের লাভই বা কি হবে! পার্কার সোলার প্রোব কিঃ প্রোব হলো এক ব...

পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ, সুপারমুন বা একটি মেঘাচ্ছন্ন রাত

The total lunar eclipse of Jan 20-21,2019 Image by Imelda Joson and Edwin Aguirre   পৃথিবীব্যাপী বিবিধ পর্যবেক্ষকদের কাছে চন্দ্রগ্রহণ একটি আকাঙ্ক্ষিত মহাজাগতিক প্রদর্শনী। চাঁদ, সূর্য এবং পৃথিবী এই প্রদর্শনীটির মূল কলাকুশলী। গ্রহণের সময় এই তিনটি জ্যোতিষ্ক মোটামুটি একই সরলরেখায় অবস্থান করে থাকে। অন্যথায়, চাঁদের পৃষ্ঠে পৃথিবীর ছায়াপাত সম্ভব হয় না এবং চন্দ্রগ্রহণও সংঘটিত হতে পারে না। গ্রহণ পুরোপুরি বুঝতে গেলে আলোক উৎসের ভিত্তিতে হরেক রকম ছায়ার ব্যাপারে ধারণা থাকা জরুরি। আলোক উৎসটি যদি বিন্দু উৎস না হয় এবং আকারে প্রতিবন্ধকের তুলনায় বড় হয়, তখন উপছায়া(Penumbra) এবং প্রচ্ছায়া(Umbra) নামক দুটি ভিন্ন পরিভাষার প্রয়োজন হয়। উপছায়া অঞ্চলটি জ্যামিতিক ছায়া অঞ্চলের আবছা অন্ধকার অংশ এবং গাঢ় অন্ধকার অংশটি হলো প্রচ্ছায়া। আলোক উৎস সূর্য,প্রতিবন্ধক রূপে পৃথিবী, প্রচ্ছায়া, উপচ্ছায়া এবং Antumbra অঞ্চল যখন সূর্য,পৃথিবী এবং চাঁদ একই সরলরেখায় থাকে, এবং চাঁদটি পুরোপুরি প্রচ্ছায়া অঞ্চলে অবস্থান করতে পারে, তখন একটি পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ সংঘটিত হয়। চাঁদ যদি পৃথিবীর প্রচ্ছায়া অঞ্চলের আংশিক সংস্পর্শে থাকে তখন সেটিকে ব...